মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

উপজেলার ঐতিহ্য

নলেন গুড় আসে এক বিশেষ ধরণের খেজুর রস থেকে, যাকে এ অঞ্চলের মানুষ নলেন রস বলে থাকে। নলেন গুড় থেকে তৈরি হয় সন্দেশ, ক্ষির-পায়েস প্রভৃতি। আশ্বিনের শেষের দিকে খেজুর গাছকে প্রস্তুত করতে হয় রস আহরণের জন্যে। গাছের বাকল কেটে "গাছ তোলা" হয়। গাছ তোলা শেষে গাছ কাটার পালা। কোমরে মোটা দড়ি বেঁধে ধারালো গাছিদা দিয়ে সপ্তাহে নির্দ্দিষ্ট দিনে গাছ কেটে রস আহরণ করা হয়।

রস পেতে হলে কিছু কাজ করতে হয়। গাছের উপবিভাগের নরম অংশকে কেটে সেখানে বসিয়ে দেয়া হয় বাঁশের তৈরি নালা। গাছের কাটা অংশ থেকে চুইয়ে চুইয়ে রস এনে নল দিয়ে ফোটায় ফোটায় জমা হয় ভাঁড়ে। প্রথম রস একটু নোনা। গাছি এক কাটের পর বিরতি দেন। কিছুদিন বিরতির পর আবার কাটেন। এবারের রস সুমিষ্ট, সুগন্ধে মৌ মৌ চারিদিক। এর সুবাস আর স্বাদ দিতে ভিড় জমায় পিঁপড়া, মৌমাছি, পাখি ও কাঠবিড়ালী। এই রসের নামই নলেন রস। আর এটি কেবল যশোরের খাজুরা এলাকাতেই সম্ভব।

এ অঞ্চলের মানুষ রস ও গুড় দিয়ে তৈরি করেন নানা ধরনের পিঠা। পিঠার পাশাপাশি বানানো হয় নানা ধরণের পাটালি। আকৃতি, রং ও স্বাদের দিকেও তাতে থাকে ভিন্নতা। এখানকার মানুষ নারিকেলের পাটালি বিশেষ পছন্দ করেন। এই পাটালি পাঠানো হয় তাদের স্বজন-আত্মীয়-পরিজনকে। আর এই বিশেষ ধরণের পাটালি কেবল এখানকার কারিগররাই বানাতে পারেন। এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বাইরে এই পাটালির আবরণ থাকে শক্ত। কিন্তু ভেতরটা গলে যাওয়া মোমের মত। এখানকার মানুষ বংশানুক্রমে এ পাটালি তৈরি করে আসছেন। সেসব বিক্রি হচ্ছে এ অঞ্চলসহ সারাদেশে। খেজুর গাছের স্বল্পতা দেখা দিচ্ছে ইটের ভাটায় অবাধে গাছ পোড়ানোর কারণে।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের মতে, এই অঞ্চলের মাটি সাধারণত বেলে দোঁ-আশ। আর পানিতে লবনাক্ততা নেই। ফলে গাছের শিকড় অনেক নিচে পর্যন্ত যেতে পারে। সব মিলিয়ে জলবায়ু উপযোগী যশোরের খাজুরা, বাঘাপাড়া, চৌগাছা, মাগুরার শালিখার খেজুরের রস সুগন্ধি ও সুস্বাদু হয়ে থাকে।

২০১১ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, এ এলাকায় এক ভাঁড় রস জালানোর পর তাতে গুড় হয় এক কেজি। যার দাম একশ’ থেকে ১শ’২০ টাকা। পাটালীও হয় একই পরিমাণ। জেলার সর্বত্রই রয়েছে খেজুর গাছের আধিক্য। প্রতিটি গ্রামে দেখা যায় শীত মৌসুমে খেজুর গাছ কেটে রস আহরনের দৃশ্য। এসব খেজুর গাছ থেকে অনেকটা খরচহীন ভাবে উৎপাদন হয়ে থাকে গুড় ও পাটালী। তবে জেলার সদর উপজেলার খাজুরার তৈরি গুড়ের রয়েছে বাড়তি কদর। এখানকার গুড় দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশে যাচ্ছে, সেখানে রয়েছে এর ব্যাপক চাহিদা। খাজুরা এলাকার বামনডাঙ্গা, তেজরোল, রাজাপুর গ্রামে গুড় উৎপাদন বেশি হয়। এসব গ্রামের অধিকাংশ কৃষক খেজুর গাছ কাটার সাথে জড়িত। আশেপাশের গ্রামগুলোতে খেজুরের রস, গুড় ও পাটালী উৎপাদনকে ঘিরে খাজুরা বাজারে গড়ে উঠেছে স্থায়ী কয়েকটি দোকান। তাছাড়া এখানে রাস্তার পাশে গুড়ের ভাঁড় আর পাটালীর ডালি নিয়ে বসেন অসংখ্য বিক্রেতা।